ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নাটকীয় উত্থান
মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তিনি দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলে। মোজতবা তার বাবার মতো নয়। বরং ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা দীর্ঘদিন ধরেই বেশ নীরব ও আড়ালে থাকা ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি কখনো সরকারি কোনো পদে ছিলেন না, জনসমক্ষে বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারও দেননি, এবং তার খুব কম ছবি বা ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে বহু বছর ধরে গুঞ্জন ছিল যে তিনি ইরানের ক্ষমতার ভেতরে পর্দার আড়ালে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে উইকিলিকস প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে “পোশাকের আড়ালের শক্তি” বলে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং বার্তা সংস্থা এপি’র মতে তাকে শাসনব্যবস্থার ভেতরে একজন “সক্ষম ও দৃঢ়” ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হতো।
তবে তার নির্বাচন বিতর্কের কারণও হতে পারে। কারণ ১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র উৎখাতের পর প্রতিষ্ঠিত ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের আদর্শ হলো—সর্বোচ্চ নেতা বংশানুক্রমে নয়, বরং ধর্মীয় মর্যাদা ও প্রমাণিত নেতৃত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবে। নিজের শাসনামলে আলি খামেনি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে কেবল সাধারণভাবে কথা বলেছিলেন।
দুই বছর আগে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের এক সদস্য বলেছিলেন যে আলি খামেনি তার ছেলেকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে প্রার্থী করার ধারণার বিরোধী ছিলেন। তবে তিনি কখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।
মোজতবা খামেনি কে?
মোজতবা ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলি খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলাভি স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ১৭ বছর বয়সে তিনি কয়েক দফায় সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। আট বছরব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরানের শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে, কারণ তারা তখন ইরাককে সমর্থন দিয়েছিল।
১৯৯৯ সালে মোজতবা ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে যান পবিত্র শহর কুমে, যা শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—তিনি তার আগে ধর্মীয় পোশাক পরতেন না, এবং কেন ৩০ বছর বয়সে গিয়ে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা শুরু করলেন তা স্পষ্ট নয়, কারণ সাধারণত কম বয়সেই এ ধরনের শিক্ষা শুরু করা হয়।
মোজতবা এখনও মধ্যম স্তরের একজন ধর্মীয় আলেম, যা তার সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বাধা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ কিছু গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা তাকে “আয়াতুল্লাহ” বলে সম্বোধন করতে শুরু করেছেন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে এটি তার ধর্মীয় মর্যাদা বাড়িয়ে তাকে নেতৃত্বের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা।
ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় “আয়াতুল্লাহ” উপাধি এবং উচ্চস্তরের ক্লাস পড়ানো একজন আলেমের জ্ঞান ও মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচনের অন্যতম শর্ত হিসেবে ধরা হয়।
তবে এর আগে একটি নজির আছে—১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর দ্রুতই আলি খামেনিকেও “আয়াতুল্লাহ” উপাধিতে উন্নীত করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ
মোজতবার নাম প্রথম বড়ভাবে সামনে আসে ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়, যেখানে কট্টরপন্থী নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ জয়ী হন।
সংস্কারপন্থী প্রার্থী মেহদি কাররৌবি খামেনিকে লেখা একটি খোলা চিঠিতে অভিযোগ করেন যে মোজতবা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও বাসিজ মিলিশিয়ার মাধ্যমে ভোটে হস্তক্ষেপ করেছিলেন এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দিয়ে আহমাদিনেজাদের জয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছিলেন।
চার বছর পরে আবার একই অভিযোগ ওঠে। ২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচন দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়, যা গ্রিন মুভমেন্ট নামে পরিচিত। কিছু বিক্ষোভকারী স্লোগান দেন—মোজতবা যেন তার বাবার উত্তরসূরি না হন।
তৎকালীন উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তফা তাজজাদেহ নির্বাচনের ফলাফলকে “নির্বাচনী অভ্যুত্থান” বলে আখ্যা দেন। পরে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা তিনি দাবি করেন মোজতবা খামেনির “সরাসরি ইচ্ছার ফল”।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর সংস্কারপন্থী দুই প্রার্থী মীর হোসেইন মোসাভি ও মেহদি কাররৌবিকে গৃহবন্দি করা হয়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোজতবা মুসাভির সঙ্গে দেখা করে তাকে আন্দোলন বন্ধ করার আহ্বান জানান বলে ইরানি সূত্র বিবিসি নিউজের পার্সিয়ান বিভাগকে জানায়।
সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অনেকেই মনে করেন মোজতবা তার বাবার কঠোর নীতিগুলোই চালিয়ে যাবেন। অনেকে এটাও মনে করেন—যে ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় তার বাবা, মা ও স্ত্রীকে হারিয়েছেন, তিনি পশ্চিমা চাপের সামনে সহজে নত হবেন না।
তবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা এবং জনগণকে বোঝানো যে তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য সঠিক নেতা।
তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা প্রায় অপ্রমাণিত, আর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি যেন বংশানুক্রমিক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে—এমন ধারণা জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
এখন মোজতবা খামেনেই একটি বড় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আলি খামেনেই-এর উত্তরসূরি যেই হোক না কেন, তিনি হবেন “নিশ্চিতভাবে নির্মূল করার লক্ষ্য।”
