বিশ্বজুড়ে সংঘাত চললে কার পকেট ভারী হয়?
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের সময়, জিসেভেন-এর জ্বালানি খাতের ধনকুবেররা অতিরিক্ত ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই লাভ এসেছে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়, বিমান হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পুরো অঞ্চলে অবকাঠামোতে বোমা হামলার ফলস্বরূপ।
সাধারণ পরিবারগুলো এই “অতিরিক্ত” খরচ বহন করেছে বাড়তি জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দামের মাধ্যমে, যা নীরবে যুদ্ধ থেকে লাভবান অল্প কিছু মানুষের পকেটে চলে গেছে।
যুদ্ধ ও সংকটের সময় অতিধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা ২০২৬ সালের কোনো নতুন বিষয় নয়।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে বাস্তব মূল্যে মোট বিলিয়নিয়ার সম্পদ প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে—প্রায় ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি—বলে সম্প্রতি অক্সফামের ‘এন্ডিং ইমপিউনিটি অ্যান্ড ইনইক্যুয়ালিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
একই সময়ে মানবিক সংকটে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৮৪ শতাংশ বেড়েছে।
২০২০ থেকে আজ পর্যন্ত কী ঘটেছে?
কোভিড-১৯ মহামারি। সুদের হার বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট ঋণ সংকট। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা এবং তার পরবর্তী খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান।
এখন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ, যা পুরো অঞ্চলকে—কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাক—অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে এবং সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল প্রবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালি বিঘ্নকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা “বিশ্ব তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন” বলে বর্ণনা করেছে।
মার্চ মাসেই বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক ১ কোটি ব্যারেলেরও বেশি কমে যায়। যুদ্ধের আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭০ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল, তা ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং সর্বোচ্চ ১১৮ ডলারেরও বেশি হয়।
পর্দার আড়ালে, যুদ্ধ দেশ ধ্বংস করে এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটায়। কিন্তু শীর্ষে থাকা কিছু মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক সময়।
অক্সফামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ফোর্বসের রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার ডেটার ভিত্তিতে, ৪১ জন জিসেভেন জ্বালানি বিলিয়নিয়ার ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত সম্মিলিতভাবে ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বাড়িয়েছেন।
এটি দিনে ৩০১ মিলিয়ন ডলারের সমান।
যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থায়ন
একই জিসেভেন দেশগুলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান—২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য তাদের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা ৪৮ বিলিয়ন ডলার কমিয়েছে।
এটি ২৯ শতাংশ হ্রাস, এবং ২০১৫ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন বিদেশি সহায়তার স্তর।
জিসেভেন বিলিয়নিয়াররা সেই ৪৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ মাত্র ৯ দিনে অর্জন করে ফেলে।
প্রতি বছর এই লাভ আরও নাটকীয় হয়ে উঠছে। এক্সনমবিল, শেভরন, শেল, টোটাল এনার্জিস, বিপি ও ইনাই—এই ছয়টি বড় তেল কোম্পানি—২০২৬ সালে সম্মিলিতভাবে ১৫২ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
এটি যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি।
এর পাশাপাশি বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী কোম্পানির মুনাফা ২৩ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সার ভুট্টা ও গমের মতো প্রধান ফসল উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে খাদ্যদ্রব্যের দাম ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩.৪ গুণ দ্রুত বেড়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির মানবিক প্রভাব কেবল পরিসংখ্যান নয়। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমান করেছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই যুদ্ধ ৩ কোটি ২৫ লাখের বেশি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে।
এছাড়া, ইতোমধ্যে ৭২ কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে থাকায় আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।
অর্থাৎ যুদ্ধ শুধু বোমা, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসই তৈরি করে না, বরং খাদ্যের দাম বাড়ায়, জ্বালানি অস্বাভাবিকভাবে ব্যয়বহুল করে, ঋণ বাড়ায়, সরকারি সেবা ভেঙে দেয় এবং মানবিক সহায়তা কর্মসূচিকে সংকুচিত করে—ঠিক যখন সেগুলো সবচেয়ে বেশি দরকার।
তাহলে বাজেট কোথায় যায়?
২০২৫ সালে জিসেভেন দেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক ব্যয় ছিল ১.৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
তাদের সম্মিলিত মানবিক ব্যয় মাত্র ১০.৩ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ সামরিক বাজেটের মাত্র ০.৭৫ শতাংশ।
অন্যভাবে বললে, জিসেভেন সরকারগুলো মানবজীবন রক্ষার চেয়ে যুদ্ধ সক্ষমতার ওপর ১৩৩ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
ছোট থেকে বড় পকেটে অর্থ প্রবাহ
একই যুদ্ধ তেল দাম বাড়িয়েছে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে চলা প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে: খাদ্য, ওষুধ, পোশাক, নির্মাণ সামগ্রী।
অন্যদিকে সার সংকট মানে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম ফলন, যা খাদ্যের দাম বাড়ায়।
প্রতিবার যখন বাজারের বিল গত মাসের চেয়ে বেশি আসে, প্রতিবার যাতায়াত ব্যয় বাড়ে, প্রতিবার পরিবারের বাজেট বদলাতে হয়—তখন সেই অর্থ হারিয়ে যায় না।
এটি ধাপে ধাপে উপরের দিকে চলে যায়, পণ্যবাজার ও ট্রেডিং ডেস্কের মাধ্যমে, এবং পৌঁছে যায় ইতিমধ্যেই শীর্ষে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে।
এই যুদ্ধের জন্য কেউ ভোট দেয়নি, কিন্তু প্রায় সবাই এর মূল্য দিচ্ছে। দারিদ্র্যের একটি সীমা আছে, কিন্তু বিলাসিতার কোনো সীমা নেই। যে রাজনৈতিক কাঠামো জবাবদিহিতা ছাড়া যুদ্ধকে অনুমতি দেয়, সেটিই সীমাহীন সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তিরা কর্পোরেট শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের অর্ধেকের মালিক, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ১ শতাংশ।
সরকারগুলো যুদ্ধের জন্য জনগণের ভোট ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু শান্তির পথে অগ্রগতি প্রায়ই ভেটো দেয়।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য তিনটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে মোট ২৭ বার ভেটো দিয়েছে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ছিল এর প্রধান ব্যবহারকারী।
সব মিলিয়ে, এই তথ্যগুলো দেখায় যে যুদ্ধ এমন এক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, যা ব্যয় নিচের দিকে ঠেলে দেয় এবং লাভ উপরের দিকে টেনে তোলে।
এটি আমাদেরকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—সমস্যাটি কি কাঠামোগত, এবং আসলে কার স্বার্থে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করছে।
