পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবার বলেছেন, তিনি ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদও ছেড়ে দেবেন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নিজ দলের চাপেই তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে।
স্টারমার বলেন, দল নতুন লেবার নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নেতা হবেন সাবেক অ্যান্ডি বার্নহাম। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ উপনির্বাচনে জয়ী হওয়া বার্নহ্যাম শুরু থেকেই দল ও দেশের নেতৃত্বের জন্য স্টারমারের চ্যালেঞ্জার হিসেবে প্রচার চালিয়েছিলেন।
গত এক দশকে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে আগাম বিদায়ের ঘোষণা দেওয়া ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হলেন স্টারমার। তার এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের গণভোটের দশম বার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। সেই সিদ্ধান্ত এখনও দেশটির অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে নিজের পদ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত স্টারমার ক্রমবর্ধমান চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। তার স্থলাভিষিক্ত এমন একজন নেতাকে দায়িত্ব দিতে তিনি সম্মত হন, যিনি সরকারের ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারবেন। তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টিকে ভূমিধস জয় এনে দিয়েছিলেন, কিন্তু এরপর থেকে তার এবং দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন নেতা
দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণ দেওয়া একই স্থান—১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে—দাঁড়িয়েই স্টারমার এ ঘোষণা দেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের শেষ দিকে তার কণ্ঠ আবেগে ভারী হয়ে আসে। সেখানে দলের কর্মী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং অসংখ্য সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
স্টারমার বলেন, আমার দল এখন যে প্রশ্নটি করছে, তা হলো—পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি কি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? তিনি আরও বলেন, এই প্রশ্নে আমার পার্লামেন্টারি দলের উত্তর আমি শুনেছি এবং আমি সেই উত্তর সানন্দে মেনে নিচ্ছি। তিনি জানান, সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবহিত করতে তিনি ব্রিটেনের সাংবিধানিক রাজা চার্লস দ্বিতীয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।
গত সপ্তাহে বার্নহ্যামের উপনির্বাচনী জয়ের পর স্টারমার পুরো সপ্তাহান্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন।
সোমবার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা থাকা বার্নহ্যাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতা হবেন, নাকি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবেন—তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্টারমার জানান, নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র গ্রহণ শুরু হবে ৯ জুলাই এবং সংসদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে ১ সেপ্টেম্বর অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই নতুন নেতা নির্বাচিত হবেন।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং যিনি গত মাসে স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন, বলেছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন। তবে বার্নহ্যামের প্রতি সমর্থন অত্যধিক হলে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করতে পারেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
স্টারমার প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দুর্বল হয়ে পড়া জনসেবা খাত সংস্কার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খেয়েছেন। বারবার রাজনৈতিক ভুলও তাকে দুর্বল করেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া। ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে কুখ্যাত অর্থদাতা জেফরি এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক ছিল।
লেবার পার্টি একদিকে উদারপন্থী ভোটারদের হারাচ্ছে ক্রমবর্ধমান গ্রিন পার্টির কাছে, অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকেএর উত্থানের মুখোমুখি হচ্ছে। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন নাইজেল ফারাজ এবং জাতীয় জনমত জরিপে তারা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি স্টারমারের সম্ভাব্য বিদায়কে তার দীর্ঘদিনের দুই সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত করেন—অভিবাসন এবং জ্বালানি নীতি।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কিয়ার স্টারমার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। তিনি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যর্থ হয়েছেন—অভিবাসন এবং জ্বালানি (উত্তর সাগরের তেল উত্তোলন শুরু করুন!)। আমি তার মঙ্গল কামনা করি! — প্রেসিডেন্ট ডি.জে.টি।
ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের সঙ্গে স্টারমারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই যুদ্ধে যুক্তরাজ্য অংশ নেয়নি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা
দেশীয় রাজনীতিতে নানা সমস্যার মুখে পড়লেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্টারমার প্রশংসা অর্জন করেছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন দিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐক্য গড়ে তোলা এবং ইরান সংঘাতজনিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমানোর প্রচেষ্টার জন্য তিনি প্রশংসিত হন।
আগামী মাসে ন্যাটো সামিটে যোগ দিতে তিনি তুরস্ক সফর করতে পারেন, যা ব্রিটিশ নেতা হিসেবে তার শেষ আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি হতে পারে।
উরসুলা ভন ডার লিয়েন স্টারমারের অবদানের প্রশংসা করে বলেন, অনেক নেতার একজন রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হতে বহু বছর লাগে, অথচ আপনি মাত্র দুই বছরেই তা হয়ে উঠেছেন। ইউরোপ ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা আপনার কারণে আরও শক্তিশালী হয়েছে। ধন্যবাদ, প্রিয় কিয়ার।
যদিও অনেক লেবার আইনপ্রণেতা বার্নহ্যামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, কেউ কেউ মনে করেন স্টারমারের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।
লন্ডনের আইনপ্রণেতা নিল কোয়েল এক্সে লিখেছেন, একটি সাজানো নাটক এবং মিডিয়ার উন্মাদনাকে পুরস্কৃত করার সম্ভাবনা দেখছি।
তিনি আরও লেখেন, পরবর্তী নেতা যখন ট্রাম্প, ইরান, ইউক্রেন, পুতিন, মাস্ক কিংবা গণমাধ্যমের পক্ষপাত রাতারাতি বদলাতে পারবেন না, তখন তার বিরুদ্ধেও একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া হবে। তাই গিলোটিনটি ধারালো রাখুন।
