ডানপন্থী এসপ্রিয়েলা কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত, এরপর কী?
ডানপন্থী ধনী ব্যবসায়ী ও আইনজীবী অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থন করেছিলেন, প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
দে লা এসপ্রিয়েলা (৪৭) তার বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ইভান সেপেদাকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। সেপেদাকে বিদায়ী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সমর্থন করেছিলেন।
রবিবারের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের এই জয় পেত্রোর অর্থনৈতিক, পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে। পেত্রো তার শাসনামলে কলম্বিয়ার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছিলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়েছিলেন এবং গাজার “গণহত্যামূলক যুদ্ধের” কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। তিনি ইসরায়েলে কয়লা রপ্তানিও নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার গণহত্যা মামলায় যোগ দিয়েছিলেন।
দে লা এসপ্রিয়েলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করবেন এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-এর মতো করে কলম্বিয়ার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করবেন।
নিচে নির্বাচনের ফলাফল ও এরপর কী হতে পারে তা দেওয়া হলো:
নির্বাচনের ফলাফল কী ছিল?
সরকারি রেজিস্ট্রারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দে লা এসপ্রিয়েলা পেয়েছেন ৪৯.৬৬ শতাংশ ভোট, আর সেপেদা পেয়েছেন ৪৮.৭ শতাংশ ভোট—অর্থাৎ প্রায় ২.৫ লাখ ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন।
৬৩ বছর বয়সী সেপেদা বলেছিলেন তিনি পেত্রোর নীতিগুলো বজায় রাখবেন। এসব নীতির মধ্যে ছিল দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্রীয় পেনশন, শ্রমিক ইউনিয়ন-সমর্থিত শ্রম সংস্কার, নতুন তেল প্রকল্পে স্থগিতাদেশ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
নির্বাচনে ৪১.৪ মিলিয়ন ভোটারের মধ্যে ২.৬৩ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছেন।
প্রথম দফা ভোটে (৩১ মে) দে লা এসপ্রিয়েলা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন—তিনি পেয়েছিলেন ৪৩ শতাংশ ভোট, সেপেদা পেয়েছিলেন ৪০ শতাংশ।
সেপেদা বোগোটায় সমর্থকদের বলেন, তিনি চূড়ান্ত ভোট পুনর্গণনার জন্য অপেক্ষা করবেন এবং প্রায় ৩৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা সংলাপের জন্য উন্মুক্ত। আমরা সমঝোতায় প্রস্তুত, যতক্ষণ তা সম্মানজনক হয় এবং দেশের উপকারে রাজনৈতিকভাবে প্রতিফলিত হয়।”
কলম্বিয়ার আইন অনুযায়ী, চূড়ান্ত যাচাইকৃত ফলাফল নোটারি ও বিচারকদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হতে হয়, যা প্রায় শেষের দিকে ছিল। তবে তখনও নিশ্চিত নয় চূড়ান্ত ফল প্রাথমিক ফলের সঙ্গে মেলে কি না।
নিরাপত্তা ছিল অনেক দে লা এসপ্রিয়েলা ভোটারের প্রধান উদ্বেগ, বিশেষ করে এমন অঞ্চলে যেখানে চাঁদাবাজি ও মাদক পাচার বেড়েছে।
অন্যদিকে অনেক সেপেদা সমর্থক আশঙ্কা করেন যে দে লা এসপ্রিয়েলার কঠোর অবস্থান নতুন করে সংঘাত বাড়াতে পারে। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বামপন্থী বিদ্রোহী, মাদক কার্টেল এবং সাবেক ডানপন্থী আধাসামরিক গোষ্ঠীর সংঘাতে জর্জরিত।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক অ্যানেট ইডলার বলেন, এই ফলাফল “কলম্বিয়ার গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিচ্ছবি”।
তিনি বলেন, “তিনি অল্প ব্যবধানে জিতেছেন। বাতিল ও অকার্যকর ভোটই তার ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল, আর অর্ধেকের বেশি মানুষ তাকে সমর্থন করেনি। এটি কোনো শক্ত ম্যান্ডেট নয়।”
কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট কে?
চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত হলে, দে লা এসপ্রিয়েলা—একজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ী যার আগে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই—কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হবেন।
তিনি নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করলেও, অনলাইন সংবাদমাধ্যম লা সিয়া ভাকিয়ার তদন্তে বলা হয় তার অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, ঋণে ডুবে আছে এবং লোকসানে চলছে। তার সবচেয়ে লাভজনক কাজ হলো আইন ফার্ম। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশে তার বাড়ি রয়েছে।
তিনি পেত্রোকে কলম্বিয়ার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমস্যার জন্য দায়ী করেছেন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি তেল ও গ্যাস খাত সম্প্রসারণ, কর কমানো এবং রাষ্ট্রের আকার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর কথাও বলেছেন। তবে তিনি পেত্রোর ২৩ শতাংশ ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও কিছু সামাজিক সুবিধা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি ৯০ দিনের জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অভিযান চালাবেন এবং মাদকচক্রের বিরুদ্ধে “মেগা-কারাগার” তৈরি করবেন, যা এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের নীতির অনুকরণ।
তিনি বলেন, “আমি সব কলম্বিয়ানদের জন্য শাসন করব, যারা আমাকে ভোট দিয়েছে এবং যারা দেয়নি।”
অ্যানেট ইডলার বলেন, পেত্রো সরকারের সময় অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যখাতে অমীমাংসিত সংকট থাকায় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, এই প্রচারণা সামাজিক মাধ্যম, এআই কনটেন্ট, ইনফ্লুয়েন্সার নেটওয়ার্ক ও বড় সমাবেশের মাধ্যমে চালানো হয়েছে, যা প্রতিপক্ষরা সমানভাবে করতে পারেনি।
তার মতে, “ট্রাম্পের সমর্থন, শক্ত নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এবং অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ইমেজ তাকে সুবিধা দিয়েছে।”
এরপর কী হবে?
নির্বাচন খুব কাছাকাছি হওয়ায় নতুন প্রেসিডেন্টকে বিভক্ত কংগ্রেসের সমর্থন পেতে কিছু পরিকল্পনা কমাতে হতে পারে। আগস্ট ৭ তারিখে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে পেত্রোর দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও কোনো দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
দেশের উচ্চ ঋণ (জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ) নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে ৫.৩ শতাংশ ঘাটতির লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে।
দক্ষিণ আমেরিকার সাম্প্রতিক ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারার অংশ হিসেবেই এই ফল দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ইডলার বলেন, এখন প্রশ্ন হলো ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয় কি না। যদিও চূড়ান্ত যাচাইয়ে ফল বদলানোর সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, দেশটি গভীরভাবে বিভক্ত, এবং নতুন সরকারের ৯০ দিনের সামরিক অভিযান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতিমধ্যেই এত বেশি যে নির্বাচনের রাতেই কালি শহরে বিক্ষোভ ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে।
২০১৬ সালে কলম্বিয়া সরকার FARC বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল, তবে সব যোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করেনি এবং কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া সম্পর্ক কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের টোন ও সমন্বয় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
দে লা এসপ্রিয়েলার জয়ের পর ট্রাম্প তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান এবং বলেন তিনি “বড় ব্যবধানে জিতেছেন”।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী।
ট্রাম্প দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা নিয়ে আগ্রাসী নীতি নিয়েছেন।
ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে আগে থেকেই সম্পর্ক খারাপ ছিল, যদিও সম্প্রতি কিছুটা উত্তেজনা কমেছিল।
ইডলার বলেন, দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, কঠোর নিরাপত্তা নীতি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মতো নীতির মাধ্যমে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই সম্পর্ক সাধারণ কলম্বিয়ানদের জন্য কতটা লাভজনক হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
