ইরানের সঙ্গে চুক্তির সমালোচকদের ‘বোকা’ বললেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানের সঙ্গে তার করা চুক্তির সমালোচকদের তীব্র আক্রমণ করে বলেন, যারা যুদ্ধ শেষ করতে গিয়ে তিনি ছাড় দিয়েছেন বলে অভিযোগ করছে তারা “বোকা”। এ মন্তব্য তিনি সুইজারল্যান্ডে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনার আগে করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের জন্য ট্রাম্প ও তার ইরানি সমকক্ষ পৃথকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যদিও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, তবুও সামনে দুই মাসের আলোচনা বাকি রয়েছে।

চুক্তিটি কখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার পর হঠাৎ করেই বুধবার প্যারিসের বাইরে অবস্থিত ভার্সাই প্রাসাদে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প ঘন কালো কালি দিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি চুক্তি যেখানে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক প্রাসাদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজন ম্যাক্রোঁর জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রাম্প স্বাক্ষর করার সময় ম্যাক্রোঁ “ব্রাভো” বলে প্রশংসা করেন।

এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “যারা মনে করে আমি ইরানের প্রতি যথেষ্ট কঠোর ছিলাম না, অথচ শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তেলের দাম দ্রুত কমছে, তারা হয় হিংসুক, খারাপ মানুষ অথবা বোকা।”

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসামায়েল বাঘায়ি। তিনি বলেন, “এখন সময় এসেছে চুক্তির বাস্তবায়ন পরীক্ষা করার।”

তেলের দাম কমেছে

অপরিশোধিত তেলের দাম বৃহস্পতিবার ৩ শতাংশেরও বেশি কমেছে, যা সপ্তাহান্তে চুক্তির খবর প্রকাশের পর শুরু হওয়া দরপতনের ধারাবাহিকতা।

শান্তির সুযোগ

চুক্তিটি ইসলামিক রিপাবলিক ইরানের সঙ্গে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে। এই সংঘাতের ফলে পাঁচ সপ্তাহ ধরে তীব্র যুদ্ধ চলেছে এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি এই চুক্তির মধ্যস্থতায় সহায়তা করেছিলেন, বলেন যে এটি “অবিলম্বে কার্যকর হবে” এবং ইরান “তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে।” তিনিও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।

এখন দুই মাসব্যাপী আলোচনা শুরু হচ্ছে। সবার নজর থাকবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয় কি না, সেদিকে।

ম্যাক্রোঁ চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি “শান্তির পথ খুলে দিয়েছে, কোনো টোল ছাড়া হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর সুযোগ দিয়েছে এবং পারমাণবিক, ব্যালিস্টিক ও আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিন সময় দিয়েছে।”

পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের একটি পাহাড়ি রিসোর্টে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করার কথা ছিল।

কিন্তু বাঘায়ি জানান, আর সরাসরি উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে শরিফ বলেন, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হবে এবং সেখানেই কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও পুনর্গঠন তহবিল

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করবে।

এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে।

রাফায়েল গ্রোসি জানান, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় “সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ” নির্ধারণে প্রস্তুত।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাবে, সম্ভবত আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে সাইটেই তা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করা হবে।

ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নীরবতা

চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই, যদিও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল এটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে।

বাঘায়ি বলেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আলোচনা করার জন্য নয়, ব্যবহার করার জন্য। আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনো পক্ষের সঙ্গে, কোনো প্রক্রিয়ায় আলোচনার বিষয় হবে না।”

সমালোচনা

ইরানের কট্টরপন্থীদের একটি অংশ চুক্তির সমালোচনা করেছে। তবে গালিবাফ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “ব্যর্থতা” বলে আখ্যা দিয়েছেন, আর পেজেশকিয়ান একে “ঐতিহাসিক” চুক্তি বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পের কিছু মিত্র তার যুদ্ধ সমাপ্তির সিদ্ধান্তে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এই যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ মার্কিন গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছিল।

সম্ভাব্য সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প জি-৭ সম্মেলনে বলেন, ইরান যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তবে তিনি “তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাতে প্রস্তুত।”

অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিকে “গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত ভুল” বলে অভিহিত করেন।

তার ভাষায়: “ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত করা যায়নি, বরং তারা শিখেছে যে হরমুজ প্রণালীকে হুমকি দিলে ফল পাওয়া যায়।”

এমনকি সাধারণত ট্রাম্পপন্থী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজও সমালোচকদের উদ্ধৃত করে বলেছে যে, এই চুক্তি ইরানকে “বিরাট আর্থিক সুবিধা” দিয়েছে, কিন্তু তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলুপ্ত করার শর্ত আরোপ করেনি।

লেবানন প্রশ্ন

চুক্তিতে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় এ নিয়ে আলোচনা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

২ মার্চ ইরানকে সমর্থন জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে লেবানন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।

চুক্তি ঘোষণার পর লেবাননে সহিংসতা কমলেও বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে একটি ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।