ইইউর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসছে তালেবান প্রতিনিধিদল

আফগান তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার আলোচনার জন্য ব্রাসেলসে যাচ্ছে, যেখানে বহিষ্কার (ডিপোর্টেশন) বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, এক তালেবান কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসীদের মধ্যে আফগানরা অন্যতম বৃহৎ গোষ্ঠী। তবে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট এই জোটের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সরকার তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বা স্বাগতিক দেশে অপরাধ করেছে—এমন ব্যক্তিদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া দ্রুততর ও ব্যাপকতর করতে চায়।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে তারা অধিকার, বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার, কঠোরভাবে সীমিত করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, মঙ্গলবারের এই বৈঠক ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকারবিষয়ক বাধ্যবাধকতাকে খর্ব করছে এবং ইউরোপ ও আফগানিস্তানের মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক ফেরেশতা আব্বাসি বলেন, “তালেবানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের যোগাযোগে মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—সেখানে মানুষকে বিপদের মুখে ফেরত পাঠানো নয়। একদিকে ইইউ দেশগুলো তালেবানের নির্যাতনের নিন্দা করছে এবং জবাবদিহিতা দাবি করছে, অন্যদিকে জোরপূর্বক আফগানদের ফেরত পাঠাতে তালেবানের সঙ্গে সহযোগিতা করছে—এভাবে তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ন করছে।”

ইইউর একটি দেশও তালেবানকে স্বীকৃতি না দেওয়া সত্ত্বেও, ব্রাসেলসের এই বৈঠকটি পাঁচ বছর আগে ক্ষমতা দখলের পর থেকে গোষ্ঠীটির কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় একটি ছোট ফাটলের প্রতীক।

ব্রাসেলসে থাকা তালেবানের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের মধ্যে রয়েছেন তালেবান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বালখি, যিনি নিউজিল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা এক তালেবান কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।

বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো বলেন, বেলজিয়াম তালেবানকে স্বীকৃতি না দিলেও ইইউর অনুরোধ অনুযায়ী তাদের ভিসা দিতে সম্মত হবে।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো শাসনব্যবস্থাকে বেলজিয়াম বৈধতা দিতে পারে না।” তিনি ইইউ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাগতিক দেশ হিসেবে বেলজিয়ামের ভূমিকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। “আমাদের স্বাগতিক-রাষ্ট্র নীতির আওতায় একটি বৈঠক সম্ভব করা স্বীকৃতি প্রদান নয়, বৈধতা প্রদান নয় এবং এটি বেলজিয়াম সরকারের আমন্ত্রণও নয়।”

নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর তালেবান প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সীমিত ভৌগোলিক বৈধতাসম্পন্ন ভিসা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা বেলজিয়ামে মাত্র ২৪ ঘণ্টা থাকতে পারবেন এবং শেনজেন অঞ্চলের অন্য কোনো দেশে প্রবেশ করতে পারবেন না।

যেহেতু বেলজিয়াম বা ইইউ কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয় না, তাই বৈঠকটি তাদের কোনো সরকারি ভবন বা স্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে না। ইউরোপীয় কমিশন এ বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়ার জন্য করা একাধিক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বহিষ্কার বাড়ানোর উদ্যোগ

ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র সোমবার বলেন, ২৭টি সদস্য দেশের সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের চাপের প্রেক্ষিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ২০টি দেশ গত অক্টোবর মাসে একটি চিঠিতে কঠোরতর অভিবাসন নীতির আহ্বান জানিয়েছিল, যার মধ্যে বহিষ্কারের হার বাড়ানোর বিষয়টিও ছিল।

মুখপাত্র মার্কুস ল্যামার্ট বলেন, “তারা কমিশনকে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন) বিষয়ে এমন কারিগরি যোগাযোগ সমন্বয়ের অনুরোধ করেছিল। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এমন ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর উপায় খুঁজছে যারা গুরুতর অপরাধ করেছে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত।”

প্রথম ইইউ-তালেবান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারিতে আফগানিস্তানে, যখন কমিশন কাবুলে একটি মিশন পাঠায়। সেখানে এখনো তাদের কর্মী রয়েছে।

অক্টোবরে পাঠানো চিঠিটি আংশিকভাবে বেলজিয়ামের অভিবাসনমন্ত্রী আনেলিন ভ্যান বসসুইটের উদ্যোগে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, “আমরা ইউরোপীয় কমিশনের কাছে একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছি: আর স্থবিরতা মেনে নেওয়া যাবে না। ইউরোপ যেন অভিবাসন ও নিরাপত্তার ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে জন্য এখনই দৃঢ় ও যৌথ পদক্ষেপের সময়।”

বসসুইট বলেন, পুরো ইইউ জুড়ে যেসব ২২,৮৭০ আফগানকে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ বাস্তবে ফিরে গেছে।

কমিশনের আরেক মুখপাত্র বলেন, এই বৈঠক “কোনোভাবেই স্বীকৃতি প্রদানের অর্থ নয়।”

আফগানিস্তানে অবনতিশীল পরিস্থিতি

গত এক বছরে আফগানিস্তানকে পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ৩০ লাখ আফগানের প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। এদের প্রায় সবাইকে ওই দুই দেশ থেকে কার্যত জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে। এতে আফগানিস্তানের মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আগে থেকেই বিদ্যমান।

তালেবান কর্তৃপক্ষ নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা, খুব অল্প কিছু পেশা ছাড়া কাজ করার নিষেধাজ্ঞা এবং জনসমক্ষে নারীরা কী পোশাক পরতে পারবে সে বিষয়ে কঠোর নিয়ম।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরোপীয় ইনস্টিটিউশনস অফিসের পরিচালক ইভ গেডি বলেন, “আফগানিস্তান থেকে মানুষ—এমনকি ইইউ কর্মীরাও—পালিয়ে যাওয়ার যে মরিয়া দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা এখনো সাম্প্রতিক স্মৃতি। এমন পরিস্থিতিতে ইইউ এখন মানুষকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে, অথচ এর মধ্যে দেশটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে—এটি অকল্পনীয়।”

২৭ সদস্যের জোটজুড়ে অভিবাসন নীতি কঠোর করার রাজনৈতিক চাপের মুখে সম্প্রতি ইইউ তাদের অভিন্ন নিয়মে ব্যাপক সংস্কার করেছে। এর লক্ষ্য বহিষ্কারের হার বাড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে তথাকথিত “রিটার্ন হাব” স্থাপনের অনুমতি, অভ্যন্তরীণ নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে স্বীকৃতি না দেওয়া সত্ত্বেও তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি।

খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে থাকা আফগানিস্তানের তালেবান সরকার মানবিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর আশা করছে।