মস্কোতে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা
ইউক্রেন বৃহস্পতিবার বহু বছরের মধ্যে মস্কোর ওপর সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, একটি বড় তেল শোধনাগারে আঘাত হানা হয়েছে এবং দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
রাশিয়া এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এএফপির সাংবাদিকরা রাজধানীর দক্ষিণ আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখেছেন। আকাশ থেকে ছাই মিশ্রিত কালো বৃষ্টিও পড়তে দেখা গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছে। এছাড়া একটি শপিং সেন্টার ও একটি আবাসিক ভবনেও আগুন লেগেছে।
পুতিনের সম্মেলনের সময় হামলা
হামলাটি এমন সময় ঘটেছে যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মধ্য রাশিয়ার কাজান শহরে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নেতাদের একটি সম্মেলনের আয়োজন করছিলেন। কাজান মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত।
দিনজুড়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিলেও পুতিন হামলা সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে “বৃহৎ প্রতিশোধমূলক হামলা” চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে “সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত জবাব” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিয়েভে রাশিয়ার প্রাণঘাতী হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রাল এবং ইউনেস্কো-সুরক্ষিত ১১শ শতাব্দীর একটি মঠেও হামলা হয়েছিল।
জেলেনস্কি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাশিয়ার জনগণ বুঝতে শুরু করুক যে এই যুদ্ধ একজন মানুষ—পুতিন—চালাচ্ছেন, কিন্তু এর মূল্য সাধারণ মানুষ দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যদি ইউক্রেন জ্বলে, তবে তোমাদের মস্কোও জ্বলবে।
বিমানবন্দর বন্ধ
এই মাসে আন্তর্জাতিক কোনো সম্মেলন চলাকালে ইউক্রেনের এটি দ্বিতীয় বড় হামলা। এর আগে মাসের শুরুতে সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ফোরাম চলাকালে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছিল।
মস্কোর বিমানবন্দরগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়, ফলে শত শত ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
দেশটির সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর শেরেমেতইয়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলার সময় যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বিমানবন্দরটি আবার চালু হয়।
তেল শোধনাগারে হামলা
মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাপোতনিয়া জেলায় অবস্থিত তেল শোধনাগারের কাছে থাকা এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, আমি জীবনে এমন কিছু দেখিনি।
২৯ বছর বয়সী এক নারী ভ্যালেন্তিনা বলেন, বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। এটা সত্যিই ভয়ঙ্কর। তার পেছনে বিশাল ধোঁয়ার স্তম্ভ দেখা যাচ্ছিল।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, “কয়েকটি ড্রোন” মস্কোর তেল শোধনাগারে পৌঁছেছিল, যদিও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানাননি।
কাছাকাছি এলাকার সড়কগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটি ড্রোন একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে এবং আরেকটির ধ্বংসাবশেষ একটি শপিং সেন্টারে আগুন লাগায়।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ওপরের তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ভিডিও ধারণকারী এক নারীর কান্নার শব্দও শোনা যায়।
‘দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা’
সোবিয়ানিন জানান, মস্কোর দিকে আসা প্রায় ১৮০টি ড্রোন রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সারা দেশে রাতভর ৫০০-রও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। তারা এসব হামলাকে “দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা” বলে আখ্যা দেয়। বিশেষ করে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। মস্কোর এই তেল শোধনাগারে চলতি সপ্তাহে এটি দ্বিতীয় ইউক্রেনীয় হামলা।
যুদ্ধবিরতির আলোচনা স্থবির
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে।
হামলার পর জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় এসেছে, এবং রাশিয়াকেই কূটনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ২০০-র বেশি ড্রোন ও একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে।
কিয়েভে এএফপি সাংবাদিকরা দেখেছেন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্ফোরণের শব্দে ভোররাতে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
আসিয়ান সম্মেলনে পুতিন
হামলার কয়েক ঘণ্টা পর পুতিন কাজানে অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশন্স-এর নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং উদ্বোধনী বক্তব্যে হামলার কোনো উল্লেখ করেননি।
সম্মেলনে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। ফিলিপাইনের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র উপস্থিত ছিলেন।
পুতিন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ সত্ত্বেও রাশিয়ায় স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলাগুলো ক্রেমলিনকে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে।
মাসের শুরুতে সেন্ট পিটার্সবার্গে হামলার পর পুতিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহে বলেছেন, রাশিয়ার উচিত ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে “একটি সমঝোতায় পৌঁছানো”।
