১৩ বার বিভিন্ন দেশের শাসক পরিবর্তন ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
গেল মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ বিদেশের মাটিতে শাসন পরিবর্তন ঘটানোর জন্য ওয়াশিংটনের সর্বশেষ প্রচেষ্টামাত্র।
এ ধরনের অভিযানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচারযুদ্ধ, পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ড, এমনকি সরাসরি আগ্রাসন ও দখল। এসবের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তার হুমকি এবং ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রয়োজনীয়তা।
১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ‘মনরো নীতি’ ঘোষণা করেন, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধে অন্য কোনো শক্তির হস্তক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ—বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পদ ও নিরাপত্তা—ঝুঁকিতে পড়লে বিদেশে হস্তক্ষেপের ধারণা বিকশিত হয়।
উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান ভূখণ্ড সম্প্রসারণের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করে—১৮৪০-এর দশকে মেক্সিকো থেকে টেক্সাস দখল এবং ১৮৯০-এর দশকে হাওয়াই রাজ্য সংযুক্তকরণ তার উদাহরণ।
১৯৪৫ সালের পর বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সক্ষমতা তৈরি হয়, যা দিয়ে তারা শাসন পরিবর্তন ঘটাতে এবং ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিজেদের অনুকূলে গড়ে তুলতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যমান গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে—যেমন ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম, ১৯৭০-এর দশকে সোমালিয়া এবং ২০১১ সালের পর লিবিয়া।
তবে শাসন পরিবর্তনের সব প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৫৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কিউবা শাসন করেন, বহুবার তাকে অপসারণের চেষ্টা—আগ্রাসন ও হত্যাচেষ্টা সত্ত্বেও। কোনো সরকার উৎখাত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও, তার পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানো অনেক কঠিন—যা ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে।
এখানে মিডল ইস্ট আই ১৯৫০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব উপায়ে শাসন পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরছে।
১৯৫৩: ইরান
১৯৫৩ সালের আগস্টে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোপন পরিকল্পনায় পরিচালিত এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এটি ঘটে মোসাদ্দেক অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (বর্তমান BP) ইরানি সম্পদ জাতীয়করণের পর। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায় এবং সেনাবাহিনীকে গোপনে সহায়তা করে। মোসাদ্দেককে দেশদ্রোহিতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে গৃহবন্দি রাখা হয়; তিনি ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত শাহের একদলীয় পশ্চিমাপন্থী শাসন চলতে থাকে। সিআইএ ২০১৩ সালে তাদের ভূমিকার কথা স্বীকার করে।
১৯৫৪: গুয়াতেমালা
ভূমি সংস্কার ও সামাজিক সংস্কারের কারণে প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনজকে ১৯৫৪ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সামরিক শাসনের অধীনে দেশটিতে কয়েক দশক ধরে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চলে।
১৯৬০: কঙ্গো
স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে সিআইএ-সমর্থিত ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত ও পরে হত্যা করা হয়। এরপর মোবুতু সেসে সেকো দীর্ঘদিন স্বৈরশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন।
১৯৬৩: ভিয়েতনাম
দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নো দিন দিয়েমকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয়। এরপর ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০ লাখ ভিয়েতনামি ও ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা নিহত হয়।
১৯৬৪: ব্রাজিল
বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্টকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন চলে।
১৯৬৫: ইন্দোনেশিয়া
সুকার্নোকে সরিয়ে সুহার্তোর ক্ষমতা দখলের সময় প্রায় ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। সিআইএ হত্যাযজ্ঞে সহায়তা করেছিল বলে নথিতে জানা যায়।
১৯৭৩: চিলি
সালভাদোর আলেন্দেকে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয়। এরপর অগাস্টো পিনোশের ১৬ বছরের স্বৈরশাসন শুরু হয়।
১৯৮৩: গ্রেনাডা
যুক্তরাষ্ট্র ৮ হাজার সেনা পাঠিয়ে গ্রেনাডা দখল করে। এই আগ্রাসনে শতাধিক মানুষ নিহত হয়।
১৯৮৯: পানামা
ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র পানামা আক্রমণ করে। পানামা সিটি অবরুদ্ধ হয় এবং শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
২০০১: আফগানিস্তান
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র তালেবান সরকার উৎখাত করে। ২০ বছর যুদ্ধের পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করলে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
২০০৩: ইরাক
ভুয়া গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগে ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হয়। এরপর দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় পড়ে।
২০০৪: হাইতি
প্রেসিডেন্ট জঁ-বারট্রঁ আরিস্তিদকে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সহায়তায় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
২০২৬: ভেনেজুয়েলা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র কারাকাসে হামলা চালিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে। মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক-সন্ত্রাসসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে।
