যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পর কায়রোতে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding) চূড়ান্ত করার কয়েক দিনের মধ্যেই মিশর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি চার-পক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করছে।
মিশরের সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, রোববার কায়রোতে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, তুরস্কের হাকান ফিদান এবং পাকিস্তানের মোহাম্মদ ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।
বৈঠকের পর একটি সম্প্রসারিত অধিবেশন ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
একজন সাবেক মিশরীয় কূটনীতিক আশারক আল-আওসাতকে বলেন, বৈঠকে “সহযোগিতা জোরদার, অংশীদারত্ব গভীর করা, আঞ্চলিক ইস্যুতে সমন্বয় বৃদ্ধি, অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা সুসংহত করা এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় মতপার্থক্য কমানোর উপায়” নিয়ে আলোচনা হবে।
এই চার দেশ কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মার্চ মাসে সৌদি রাজধানী রিয়াদে এক বৈঠকের মাধ্যমে। পরে ইসলামাবাদ ও আনতালিয়ায় আরও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
এই বৈঠক এমন সময় হচ্ছে, যখন সুইস সরকার জানিয়েছে যে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়ার কথা থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
ঘোষণাটি আসে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পরিকল্পিত সফর বাতিল হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার জানান, কিছু আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে অনুমোদন দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার দুই দেশের প্রেসিডেন্ট সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পর ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
মিশরীয় কাউন্সিল ফর ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সদস্য এবং সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ হেগাজি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে গভীর কৌশলগত পরিবর্তনের সময়ে এই চার-পক্ষীয় বৈঠক আঞ্চলিক পরামর্শ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি যুদ্ধবিরতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সামরিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা, এবং গাজায় চলমান যুদ্ধের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন।
হেগাজির মতে, প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর এই “পরামর্শমূলক চতুষ্টয়” নিজেকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে প্রমাণ করেছে, যা আঞ্চলিক দেশ ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধান এবং উত্তেজনা কমাতে সক্ষম।
তিনি বলেন, বৈঠকের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক সমন্বয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে “ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তি” সুসংহত করা, আলোচনা অব্যাহত রাখা, গাজা ও লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নিয়ে কথা হতে পারে।
হেগাজির মতে, বৈঠকটি চার দেশের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সমন্বয় আরও গভীর করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বিষয়ক একটি আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হতে পারে, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সফল অভিজ্ঞতার অনুরূপ হবে।
এ ধরনের সম্মেলনের উদ্দেশ্য হবে আঞ্চলিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য নীতিগত ঘোষণা প্রণয়ন এবং সংলাপ, বিরোধ নিষ্পত্তি, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতা জোরদারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
শুক্রবার মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেলাত্তি পাকিস্তানের ইসহাক দার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপ করেছেন।
এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, মিশর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এবং সব পক্ষের স্বার্থ ও উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে একটি চূড়ান্ত ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছাতে সমন্বয় ও যৌথ পরামর্শ অব্যাহত রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় আবদেলাত্তি আশা প্রকাশ করেন যে, এই সমঝোতা স্মারক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়ে সব সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দেবে।
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তি হবে যা সব পক্ষের উদ্বেগ বিবেচনায় নেবে এবং অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
হেগাজি বলেন, আগামী পর্যায়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে প্রধান আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে “গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ” অব্যাহত রাখা জরুরি। এর মাধ্যমে ধারাবাহিক সংকট ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে স্থিতিশীল নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও উন্নয়নভিত্তিক একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সব পক্ষ আশ্বস্ত হয় এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, অভিন্ন স্বার্থ এবং বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি পরিহারের ভিত্তিতে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংলাপের কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান, যাতে অঞ্চলটি আবার উত্তেজনা ও সংঘাতের চক্রে ফিরে না যায় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও উন্নয়নের জন্য কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা যায়।
