ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলার পাশে বিশ্ব
ভেনেজুয়েলায় বৃহস্পতিবার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬৪ জন নিহত এবং প্রায় এক হাজার মানুষ আহত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সহানুভূতি ও সহায়তার প্রস্তাব আসতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সাহায্যে প্রস্তুত
“মহান ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর আঘাত হানা দুটি বড় ভূমিকম্প আকারে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে,” যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন।
“যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, আগ্রহী এবং সক্ষম। আমি আমাদের সরকারের সব সংস্থাকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছি। আমরা আমাদের নতুন ও মহান বন্ধুদের পাশে থাকব।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভূমিকম্প মোকাবিলায় সরকারের সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বাহরাইন সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, এটি হবে পুরো সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ। এটি হবে বড়, দ্রুত এবং কার্যকর। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ মন্ত্রণালয় সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চীনও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা পাঠাতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গাও জিয়াকুন বলেন, “ভেনেজুয়েলার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত উপায়ে চীন সম্ভাব্য সব সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”
তিনি জানান, “এখন পর্যন্ত কোনো চীনা নাগরিক হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।”
লাতিন আমেরিকার সংহতি
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও দ্রুত সংহতি ও সহায়তার প্রস্তাব দেয়।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম এক্সে লিখেছেন, “এই মুহূর্তে তারা বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসাকর্মীর সহায়তা চেয়েছে। মেক্সিকো সবসময় সংহতির পাশে ছিল এবং থাকবে।”
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, তিনি গভীর উদ্বেগ ও দুঃখের সঙ্গে ভূমিকম্পের খবর শুনেছেন এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করবেন।
এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে জানান, তিনি ৩০০ উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিক এবং ৫০ টন সরঞ্জাম, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রেখেছেন।
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেন, কিউবার স্বাস্থ্যকর্মীরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
আর্জেন্টিনা, কোস্টারিকা, চিলি ও উরুগুয়ে সংহতি প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ইকুয়েডর ও ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া
জাপান ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে। একই দিনে জাপানও ৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
জাপানের উপ-প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাসানাও ওজাকি বলেন, “জাপানি নাগরিকদের আহত হওয়ার কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই।”
ইরান উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগায়ী বলেন, ইরান প্রয়োজনীয় যেকোনো উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা দিতে প্রস্তুত এবং ভেনেজুয়েলার সরকার ও জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানায় স্পেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি “পূর্ণ সমর্থন” জানিয়ে বলেন, “আমাদের চিন্তা নিহতদের ও তাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।”
একই ধরনের বার্তা দেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ।
ফ্রান্স সরকার জানায় যে তারা ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে রয়েছে। পরে তারা নিশ্চিত করে যে কারাকাসে তাদের দূতাবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্পেন ও ফ্রান্স কয়েক ডজন উদ্ধারকর্মী পাঠানোর ঘোষণা দেয়। জার্মানি ছয়টি সামরিক পরিবহন বিমান পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয় এবং নেদারল্যান্ডস দুই মিলিয়ন ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার মধ্যে উদ্ধারকর্মী, অনুসন্ধানী কুকুর এবং সরঞ্জাম থাকবে। সুুইজারল্যান্ডও জরুরি উদ্ধার দল ও প্রশিক্ষিত কুকুর পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
ভ্যাটিকানের সহায়তা
পোপ লিও চতুর্দশ ভেনেজুয়েলার জন্য প্রাথমিক জরুরি সহায়তা হিসেবে ১ লাখ ইউরো (প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ডলার) বরাদ্দ করেছেন বলে ভ্যাটিকান জানিয়েছে।
এই অর্থ ভ্যাটিকানের দাতব্য ও ত্রাণ সংস্থা অ্যাপোস্টোলিক আলমনরি থেকে দেওয়া হবে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ
যুদ্ধরত দুই দেশ ইউক্রেন ও রাশিয়াও সমবেদনা জানিয়েছে, যদিও কোনো নির্দিষ্ট সহায়তার প্রস্তাব দেয়নি।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচটনার বলেন, সংস্থাটি সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আগামী দিনগুলোতে সরকার-নেতৃত্বাধীন ত্রাণ কার্যক্রমকে সহায়তা করতে ব্যাপক যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে যে তারা তাদের স্যাটেলাইট নজরদারি ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। ইউরোপীয় সহায়তা কমিশনার হাদজা লাহবিব বলেন, “আমরা সহায়তা বাড়াতে প্রস্তুত।”
এদিকে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ (প্রায় ২৫ লাখ ডলার) বরাদ্দ করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলান রেড ক্রস ইতোমধ্যে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় তহবিল সংগ্রহ অভিযানও চালু করবে।
