ফ্রান্সে গরমে সাঁতার কাটতে নেমে ৪০ জনের মৃত্যু
ফ্রান্সে সপ্তাহান্ত থেকে নজরদারিবিহীন এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে ৪০ জন ডুবে মারা গেছেন বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা পানিতে নেমেছিলেন।
ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেনও তীব্র গরমে পুড়ছে। কিছু অঞ্চলে রেকর্ড তাপমাত্রা স্কুল ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, ইউরোপে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি, ফলে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।
বর্তমান তাপপ্রবাহের কারণ হলো ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত বিন্যাস, যা গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’র মতো দেখতে। এর মাঝখানে থাকে গরম বায়ুর স্ফীতি এবং দুই পাশে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই ব্যবস্থা একটি তথাকথিত ‘হিট ডোম’ বা তাপ গম্বুজ তৈরি করছে, যা পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের ওপর গরম বাতাস আটকে রেখে দিন দিন তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে, যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃষ্টিপাতও বাড়ছে।
ফ্রান্সজুড়ে তাপ সতর্কতা
মেতেও ফ্রান্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার ফ্রান্সের অধিকাংশ এলাকা কঠোর তাপ সতর্কতার আওতায় রয়েছে এবং তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পশ্চিম ফ্রান্সের কিছু এলাকায় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা প্রত্যাশিত।
দেশজুড়ে তরুণসহ অনেক মানুষ ঠান্ডা হতে খাল ও নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছেন। ফরাসি ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেন, গরম থেকে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা তিনি বুঝতে পারেন, তবে অননুমোদিত বা বিপজ্জনক এলাকায় সাঁতার না কাটার আহ্বান জানান।
তাপপ্রবাহ নিয়ে জরুরি বৈঠকের আগে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেন, ১৮ জুন থেকে তাপপ্রবাহ-সংশ্লিষ্ট কারণে ৪০টি ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কারপঁত্রা শহরে একটি পরিবারের বাড়ির বাইরে গাড়ির ভেতর অচেতন অবস্থায় পাওয়া দুই শিশু—বয়স ২ ও ৪ বছর—কে উদ্ধারকারীরা বাঁচাতে পারেননি বলে এক প্রসিকিউটর জানান।
প্যারিসের একটি এলাকায় পৌর কর্তৃপক্ষ ২৫ বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বিনামূল্যে সিনেমার টিকিট দিয়েছে, যাতে তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতি
প্যারিসে কর্মস্থলে যাওয়া মানুষদের গরমে দৃশ্যত কষ্ট পেতে দেখা গেছে। অনেকেই মেট্রোতে হাতপাখা বহন করছিলেন। প্রচণ্ড গরমে রাতের ঘুমও বিঘ্নিত হচ্ছে, বিশেষত এমন অ্যাপার্টমেন্টে যেখানে তাপ মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। প্যারিস ও ব্রাসেলসের মধ্যকার কিছু ট্রেনসহ কয়েকটি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অর্থনীতিও এর প্রভাব অনুভব করছে।
ফ্রান্সের নিয়োগকর্তা সংগঠন মেদেফের প্রধান প্যাট্রিক মার্টিন বিএফএম টিভিকে বলেন, “ফ্রান্স ধীরগতিতে চলছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা সম্ভব তাদের কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করছে।”
প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি শেষ হয়ে গেছে।
ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন ও বেলজিয়ামও তাপপ্রবাহে আক্রান্ত
ইতালিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫টি শহরের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং সরকার কিছু খাতে কাজ স্থগিত বা সীমিত করার ব্যবস্থা নিয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বিকেলে আল্পস ও আপেনাইন পর্বতমালার ওপর ঝড় তৈরি হতে পারে, যা প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি নিয়ে আসবে এবং পরে তা উত্তরাঞ্চলের সমতল এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ব্রিটেনও তীব্র গরমের কবলে রয়েছে। দেশটির আবহাওয়া অফিস পূর্বাভাস দিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে—যা জুন মাসের নতুন রেকর্ড হতে পারে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার তা আরও বাড়তে পারে।
অনেক স্কুল জানিয়েছে যে তারা আগেভাগে ছুটি দেবে, কারণ পুরোনো ভবনগুলোতে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করা উপযুক্ত নয়।
স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা দেশের বিভিন্ন অংশে লাল সতর্কতা জারি করেছে এবং সতর্ক করেছে যে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। সোমবার আন্দুহারে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পর এই সতর্কতা জারি করা হয়।
রাতের সময়ও তেমন স্বস্তি মেলেনি; মঙ্গলবার ভোরে প্রায় ৩০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা এখনও ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল।
বেলজিয়ামে তীব্র গরমের কারণে ব্রাসেলসের কাছে তেরভুরেনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিকটবর্তী একটি গির্জায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছে।
বিদ্যালয়টি ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, “শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত গরম, তাই আমরা গির্জায় পরীক্ষা নেব।” তারা গির্জার চেয়ারের সারিতে বসে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার ভিডিওও প্রকাশ করেছে।
পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন
ইউরোপজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে। ব্রিটেনের নেটওয়ার্ক রেলও যাত্রীদের বুধবার ও বৃহস্পতিবার শুধুমাত্র অত্যাবশ্যক ভ্রমণ করার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ ওই সময় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
অবকাঠামো রক্ষার জন্য অপারেটররা গতি সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় অনেক রেলসেবা ব্যাহত বা ধীরগতির হতে পারে।
লন্ডনে একাধিক তীব্র বজ্রঝড়ের কারণে রাতারাতি কিছু পরিবহন রুটে বিঘ্ন ঘটেছে, যার মধ্যে হিথ্রো বিমানবন্দরও রয়েছে।
