ট্রাম্প বৈরুতকে রক্ষা করেছেন, হিজবুল্লাহকে নয়
কয়েকটি ভয়াবহ ঘণ্টার জন্য অনেক লেবানিজ নাগরিক বিশ্বাস করেছিলেন যে বৈরুত আবারও একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। ইসরায়েল দক্ষিণ বৈরুতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরিবারগুলো আতঙ্কিত ছিল। পুরোনো সেই ভয় আবার ফিরে এসেছিল—লেবানন আবারও এমন একটি যুদ্ধের কিনারায় দাঁড়িয়ে, যা সে নিজে বেছে নেয়নি এবং যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই।
তারপর ডোনাল্ড ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করেন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ইসরায়েল বৈরুতে সেনা পাঠাবে না এবং ইতিমধ্যে যেসব বাহিনী সেদিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমেরিকান বর্ণনা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহও হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
অনেক লেবানিজের কাছে এটি ছিল একই সঙ্গে স্বস্তি এবং বিস্ময়ের বিষয়। স্বস্তি—কারণ অন্তত আপাতত বৈরুত রক্ষা পেয়েছে। বিস্ময়—কারণ ওয়াশিংটন, যা ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র, একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইসরায়েলকে সংযত করেছে বলে মনে হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
হিজবুল্লাহ বরাবরের মতো এটিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। তারা দাবি করবে যে তাদের অস্ত্র লেবাননকে রক্ষা করেছে, ইসরায়েলকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে এবং তথাকথিত “প্রতিরোধ” নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছে।
কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
যা ঘটেছে তা হলো, ট্রাম্প এবং বেশ কয়েকজন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী পক্ষ লেবাননকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। তারা হিজবুল্লাহকে রক্ষা করেনি; তারা চেষ্টা করেছে যাতে বৈরুত, লেবাননের রাষ্ট্র এবং সাধারণ লেবানিজ জনগণ হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্তের পুরো মূল্য না দেয়।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে থামিয়েছেন এই কারণে নয় যে হিজবুল্লাহ কোনো কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছে। তিনি তা করেছেন কারণ বৈরুতে আরেকটি বড় হামলা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে পারত, আমেরিকার আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ জটিল করে তুলতে পারত এবং লেবাননকে ওয়াশিংটন, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর সংঘাতের আরেকটি ফ্রন্টে পরিণত করতে পারত।
এই অর্থে, লেবানন আর শুধু লেবাননের বিষয় নয়। এটি এখন প্রভাব, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর দর-কষাকষির অংশ।
ইরান এবং তার মিত্ররা দেখাতে চাইছে যে লেবানন এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো বৃহত্তর আলোচনায় এটি একটি দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু লেবাননকে ইরানের তাস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়, এবং লেবানিজদেরও তাদের দেশকে এমন কোনো দর-কষাকষির উপকরণে পরিণত করার প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
এই কারণেই যুদ্ধবিরতি কোনো বিজয় নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা।
প্রথম সতর্কবার্তাটি হিজবুল্লাহর জন্য। যদি তারা ড্রোন হামলা, রকেট নিক্ষেপ বা এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যায় যা ইসরায়েলকে উত্তেজনা বাড়ানোর অজুহাত দেয়, তাহলে পরের বার ইসরায়েল হয়তো আমেরিকার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবে না। ট্রাম্প একবার নেতানিয়াহুকে থামিয়েছেন, কিন্তু আবারও তা করবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কোনো লেবানিজ নাগরিকেরই নিজের নিরাপত্তা এই ধারণার ওপর নির্ভর করা উচিত নয় যে কোনো বিদেশি প্রেসিডেন্ট সবসময় সময়মতো আরেকটি ফোনকল করবেন।
এই সতর্কবার্তা লেবাননের রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতিও প্রযোজ্য।
বহু বছর ধরে লেবাননের নেতারা একটি সুবিধাজনক কল্পকাহিনির আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন—রাষ্ট্র নাকি হিজবুল্লাহর সামরিক সিদ্ধান্ত থেকে আলাদা। হিজবুল্লাহ যখন কোনো সংঘাত শুরু করে, কর্মকর্তারা বলেন যে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ধ্বংস নেমে এলে তারা সমগ্র লেবাননের পক্ষ থেকে কথা বলেন। বিদেশি শক্তি হস্তক্ষেপ করলে তারা নিজেদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কিন্তু এই কল্পকাহিনি ভেঙে পড়ছে।
নবিহ বেরির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের স্পিকার, শিয়া আমল আন্দোলনের নেতা এবং হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তিনি নিজেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছেন, কারণ তিনিই যুদ্ধবিরতির জন্য হিজবুল্লাহর প্রস্তুতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
এখন তিনি আর কেবল পর্যবেক্ষক বা মধ্যস্থতাকারী নন। এখন তার কাছ থেকে ফল দেখানোর প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
যদি হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে, তবে বেরি আর বলতে পারবেন না যে বিষয়টি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিশ্চয়তা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি নিজেকে সরাসরি হিজবুল্লাহর আচরণ এবং তার ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে এটি অশুভ ইঙ্গিত বহন করে।
দীর্ঘদিন ধরে বেরি এমন একজন জাতীয় ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যিনি একই সঙ্গে হিজবুল্লাহ, লেবাননের রাষ্ট্র, ওয়াশিংটন এবং আঞ্চলিক রাজধানীগুলোর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কিন্তু এই ঘটনা তাকে আরও স্পষ্টভাবে হিজবুল্লাহর শিবিরে দাঁড় করিয়েছে।
যদি যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যর্থতার দায় তাকেও ভাগ করে নিতে হবে। যদি তিনি হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে তার দেওয়া নিশ্চয়তা অর্থহীন ছিল। আর যদি তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে লেবাননের কর্মকর্তাদের এই ভান করা বন্ধ করতে হবে যে হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্তগুলো লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে কোনো আলাদা জগতে নেওয়া হয়।
সংকটের মূল সমস্যাটি এখানেই: লেবানন ট্রিগারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে না।
কূটনীতি হয়তো সাময়িকভাবে লেবাননকে রক্ষা করতে পারে। এটি কোনো হামলা বিলম্বিত করতে পারে, বৃহত্তর যুদ্ধ ঠেকাতে পারে অথবা আলোচনার জন্য সময় তৈরি করতে পারে। কিন্তু কূটনীতি কখনোই সার্বভৌমত্বের বিকল্প হতে পারে না।
একটি দেশ অনির্দিষ্টকাল বিদেশি নেতাদের জরুরি ফোনকলের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে পারে না। একটি রাষ্ট্র ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে পারে না যাতে তারা ইসরায়েলকে থামায়, অথচ হিজবুল্লাহ সিদ্ধান্ত নেয় কখন লেবানন যুদ্ধে প্রবেশ করবে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি শুধু কূটনৈতিক বৈঠক বা বিবৃতির মাধ্যমে শেষ হবে না। মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে—হিজবুল্লাহর অস্ত্র এবং এমন একটি লেবানিজ রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি, যা নিজের কর্তৃত্ব কার্যকর করতে সক্ষম।
যতদিন হিজবুল্লাহ রাষ্ট্রের বাইরে একটি সশস্ত্র শক্তি হিসেবে থাকবে, ততদিন ইসরায়েল দাবি করবে যে তাদের সেখানে অবস্থান, হামলা এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ রয়েছে।
এর মানে এই নয় যে ইসরায়েলকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। লেবাননের বেসামরিক জনগণকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংস অগ্রহণযোগ্য। হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ হলেই বৈরুতকে হুমকির মুখে ফেলা উচিত নয়।
কিন্তু লেবানিজদের নিজেদের প্রতিও সৎ হতে হবে। লেবাননের ভেতরে যদি একটি পক্ষ যুদ্ধ শুরু করার অধিকার নিজের হাতে রাখে এবং বাকি দেশকে তার পরিণতি ভোগ করতে হয়, তাহলে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি টিকতে পারে না।
আরেকটি বিপজ্জনক বিভ্রম হলো—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্য মানেই হিজবুল্লাহর প্রভাব বেড়েছে। এটি বাস্তবতার চেয়ে বেশি আশাবাদী কল্পনা।
ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের মধ্যে চাপ, ক্ষোভ বা কৌশলগত মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে শক্তিশালী করতে যাচ্ছে বা লেবাননকে ইরানের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছে।
বরং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হলো—ওয়াশিংটন চায় আঞ্চলিক যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া এড়াতে, একই সঙ্গে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বজায় রাখতে।
হিজবুল্লাহ হয়তো সময় কিনতে চাইবে। ইরান হয়তো লেবাননকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে। লেবাননের রাজনীতিবিদরা হয়তো অস্পষ্ট ভাষায় আরেকটি সংকট পার করে দিতে চাইবেন।
কিন্তু সাধারণ লেবানিজদের আর এসব খেলা সহ্য করার সামর্থ্য নেই।
তারা বাঁচতে চায়। তারা চায় তাদের সন্তানরা ড্রোনের শব্দ শুনে আতঙ্কিত না হয়ে ঘুমাতে পারুক। তারা চায় দক্ষিণাঞ্চলে আগুন জ্বলা বন্ধ হোক। তারা চায় বৈরুতকে আর হুমকির মুখে পড়তে না হোক। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যা যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত নেবে—এমন কোনো মিলিশিয়া নয়, যা দেশকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে বেঁচে থাকাকেই বিজয় বলে ঘোষণা করে।
যদি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে, তবে তাকে স্বাগত জানানো উচিত। ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে যেকোনো বিরতি আরেকটি ভয়ের রাতের চেয়ে ভালো।
কিন্তু কেউ যেন বিরতিকে শান্তি ভেবে ভুল না করে।
শান্তির জন্য শুধু ট্রাম্পের নেতানিয়াহুকে সংযত করাই যথেষ্ট নয়। শুধু বেরির বার্তা আদান-প্রদান বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতিও যথেষ্ট নয়। শুধু হিজবুল্লাহর শান্ত থাকার ঘোষণা দিয়েও হবে না, যদি তাদের হাতে সেই ক্ষমতা থেকেই যায় যে তারা যখন খুশি, তেহরানের স্বার্থে, আবার সেই শান্তি ভঙ্গ করতে পারে।
এই মুহূর্তে লেবানন একটি সাময়িক অবকাশ পেয়েছে।
কিন্তু অবকাশ সার্বভৌমত্ব নয়।
আর যতদিন হিজবুল্লাহ এমন আচরণ করবে যেন লেবাননের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত তার একার অধিকার, ততদিন পরবর্তী সংকট আরও দ্রুত ফিরে আসতে পারে—এবং পরেরবার হয়তো একটি ফোনকল বৈরুতকে বাঁচাতে পারবে না।
