চুক্তি তো হলো, এবার কী অপেক্ষা করছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান সামরিক সংঘাত এখন থেমে গেছে। তবে আলোচনার স্বাভাবিক যুক্তি অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ ঘটতেই থাকে, যা উভয় পক্ষেরই যুদ্ধের পথে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন—যদিও প্রত্যেকের কারণ আলাদা।
প্যারিস ও তেহরানের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পর্যায়ে দূরবর্তীভাবে অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি কেবলমাত্র একটি দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রার প্রথম ধাপ। চুক্তিটি মূলত আলোচনার জন্য প্রধান বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে, কিন্তু সেগুলোর সমাধান ভবিষ্যৎ আলোচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছে, যা সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আলোচনা সম্ভবত ওবামা আমলের আলোচনার চেয়েও কঠিন হবে, যার ফল ছিল সেই পারমাণবিক চুক্তি, যা পরে ট্রাম্প বাতিল করেছিলেন।
আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ইসরায়েলের পুনরায় এমন এক পথে প্রবেশ, যেখান থেকে তাকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছিল। লেবানন ও গাজার ক্ষেত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল আবারও সক্রিয় হয়েছে, কারণ তারা এই দুটি অঞ্চলকে চুক্তি-পরবর্তী পরিস্থিতি গঠনের আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।
লেবাননে ইসরায়েল ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। তারা সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করতে বা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার এই লক্ষ্য ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে যৌথভাবে সমর্থিত। অন্যদিকে ইরান, যা দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎকে বৃহত্তর ইরানি সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত রাখতে চেয়েছে, ইসরায়েলের এই অবস্থানকে দেখে হিজবুল্লাহকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইরান এতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং চায় সব অমীমাংসিত বিষয়ের চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই কার্ডটি সক্রিয় থাকুক।
তবে ইসরায়েলের দৃষ্টিতে গাজার গুরুত্ব লেবাননের চেয়েও অনেক বেশি। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, ইসরায়েলি কৌশলগত চিন্তাধারায় গাজা এমন এক অস্তিত্বগত সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে, যা তারা মনে করে এখনো বিভিন্ন ফ্রন্টে চলছে।
গাজার আলোচনা কখনোই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করা যায় না। ভৌগোলিকভাবে পৃথক হলেও, বাস্তবে এই দুটি অঞ্চল এখন একক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল গাজা পুরোপুরি দখলের হুমকি দিচ্ছে, কারণ সামরিক শক্তি ও অবরোধের মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে সেখানে ভূগোল ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সময়ে তারা পশ্চিম তীর সংযুক্ত করারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদিও আন্তর্জাতিক—এমনকি মার্কিন—প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আনুষ্ঠানিক সংযুক্তিকরণ এখনো সীমিত রয়েছে, তবুও ইসরায়েল সেখানে সরাসরি ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক চাপও তীব্র করছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক ভূমিকা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে, কারণ তাদের শাসনক্ষমতার অবশিষ্ট উপায়গুলোও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক সমাধানে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়বে।
এভাবে লেবানন ও ফিলিস্তিন যেন দুটি জিম্মিতে পরিণত হয়েছে, যা ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পথে প্রবেশের সুযোগ এবং চাপ সৃষ্টির উপায় দিচ্ছে। ইসরায়েল এমন এক সময়ে এই সুবিধা নিচ্ছে, যখন বিশ্বের মনোযোগ মূলত ইরান প্রশ্নের সমাধান এবং তার জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানির দাম ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর প্রভাব দূর করার দিকে কেন্দ্রীভূত। বিশ্ব যখন সেই দিকে তাকিয়ে আছে, তখন ইসরায়েল এই দুই “জিম্মির” ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের ভাষা বা চেতনার ভিত্তিতে কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক কাঠামো এখন নেই। ওই প্রস্তাবের সূচনা গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল। এটি ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব শান্তি পরিষদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, যার কাছে ইসরায়েল কার্যত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্য ইসরায়েলের ধারাবাহিক চাপ পরিস্থিতি বদলে দেয় এবং মনে হতে থাকে যে সেই যুদ্ধের ঝড় মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী ও সমন্বিত শান্তির সব প্রতিশ্রুতিকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
এখন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত শুধু ইরানের সঙ্গে অর্জিত সাফল্য উদযাপন না করে বাস্তবতার আরও গভীর মূল্যায়ন করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত প্রয়োজনগুলো আরও স্পষ্টভাবে বোঝা।
বিশ্বের প্রায় সব দেশই একমত যে, অঞ্চলটির যুদ্ধগুলো বন্ধ করে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তারা এটাও মনে করে যে, এ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিরল আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থেকে একমাত্র ব্যতিক্রম যেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল, যা এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিস্ফোরক বিষয়গুলোকে শান্তির পথে সমাধানের পরিবর্তে বৃহত্তর প্রভাব ও দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
লেখক: নাবিল আমর, ফিলিস্তিনি লেখক ও রাজনীতিবিদ
