ইরানের ড্রোনের সামনে আর কতদিন টিকতে পারবে উপসাগরীয় দেশগুলো?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছে। তেহরান প্রত্যাশিতভাবেই ইসরায়েল এবং অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা করেছে।

কিন্তু এর পাশাপাশি উপসাগরের প্রতিটি দেশেও আঘাত করেছে—যার মধ্যে সৌদি আবর ও কাতারের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে।

এই হামলাগুলোর কিছু—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর—প্রতিশোধমূলক। এর মাধ্যমে ইরান দেখাতে চায় যে তাদের সর্বোচ্চ নেতা, বহু কর্মকর্তা এবং শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাকে তারা হালকাভাবে নেবে না।

কিন্তু তেল ও গ্যাস স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) লক্ষ্য করে হামলা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।

তেহরান শুধু সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবেও এটি করছে—এক ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধ (financial attrition) কৌশলের মাধ্যমে, যাতে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

রোববার পর্যন্ত ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ১৫২টি ক্ষেপণাস্ত্র, ৫০৬টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অর্থাৎ প্রতিরোধের হার ছিল ৯২ শতাংশের বেশি।

এদিকে কাতার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর একদিন পর তাদের ওপর ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র, ১২টি ড্রোন দিয়ে হামলা করা হয়। এর মধ্যে ৬৩টি ক্ষেপণাস্ত্র, ১১টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ প্রতিরোধ সফল হয়েছে।

“ই-বাইক আটকাতে ফেরারি ব্যবহার”

স্টিমসন সেন্টারের (Stimson Center) সিনিয়র ফেলো এবং বিমানশক্তি বিশেষজ্ঞ কেলি গ্রিয়েকো (Kelly Grieco) বলেছেন, আমিরাতের ৯২ শতাংশ প্রতিরোধ হার “অসাধারণ”।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন: “এই প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে যে আর্থিক ব্যয় হচ্ছে তা বিশাল। ফলে সামরিকভাবে জয়ের মতো মনে হলেও কৌশলগতভাবে এটি ব্যয়বহুল ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।”

তিনি হিসাব করে দেখান, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১–২ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ইরানের শাহেদ ড্রোনের (Shahed drone) দাম প্রায় ২০,০০০–৫০,০০০ ডলার। এই হিসাবে রোববার পর্যন্ত আমিরাতের ওপর হামলায় ইরানের মোট খরচ ছিল ১৭৭ মিলিয়ন থেকে ৩৬০ মিলিয়ন ডলার।

কিন্তু এই হামলা প্রতিহত করতে আমিরাতের খরচ হয়েছে অনেক বেশি।

গ্রিয়েকোর হিসাব অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হামলা ঠেকাতে আমিরাতের খরচ হয়েছে ১.৪৫ বিলিয়ন থেকে ২.২৮ বিলিয়ন ডলার—যা ইরানের খরচের ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি।

বিশেষ করে ড্রোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ এগুলো খুব সস্তায় তৈরি করা যায়।

তিনি বলেন: “ড্রোনে ইরান যত ১ ডলার খরচ করেছে, সেগুলো ভূপাতিত করতে আমিরাতকে প্রায় ২০ থেকে ২৮ ডলার খরচ করতে হয়েছে। এটাই ইরানের কৌশলের মূল।”

দ্য ইকোনোমিস্টের (The Economist) সাংবাদিক গ্রেগ কার্লস্টর্ম (Gregg Carlstrom) এই অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তুলনা করেছেন “ই-বাইক আটকাতে ফেরারি ব্যবহার করার” সঙ্গে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার একই কৌশল

সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা দুর্বল করা নতুন কিছু নয়। রাশিয়াa দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেন যুদ্ধে এই কৌশল ব্যবহার করছে। রাশিয়া শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলে।

এই ড্রোনগুলো সস্তা এবং দ্রুত বড় পরিসরে তৈরি করা যায়। কিন্তু এগুলো ধ্বংস করার জন্য যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দরকার তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং সরবরাহ শৃঙ্খলও জটিল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিচ্ছে, তবে ইউক্রেন আরও সাহায্যের দাবি জানিয়ে আসছে। কিংস কলেজ লন্ডনের (King’s College London) একজন বিশেষজ্ঞ ডেভিড জর্ডান (David Jordan) বলেন, ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধে প্রায় ছয় সপ্তাহ পরপর নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল আসে।

এর ফলে কখনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি সফল হয়, আবার কখনও কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ে।

তিনি বলেন ইউক্রেন কিছু নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যেমন: পরিবহন বিমান অ্যান্তোনভ এএন-২৮ (Antonov An-28)-এ মিনিগান বসানো, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে ড্রোনের যোগাযোগ বন্ধ করা।

শুরুর দিকে ইউক্রেন ড্রোন ধ্বংস করতে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবস্থা (Patriot missile system) ব্যবহার করত। কিন্তু গ্রিয়েকোর মতে এটি টেকসই ছিল না, কারণ এগুলো খুব ব্যয়বহুল এবং ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা সীমিত।

পরে ইউক্রেন তুলনামূলক সস্তা বিকল্প ব্যবহার শুরু করে, যেমন জেপার্ড অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট সিস্টেম (Gepard anti-aircraft system)—যা শীতল যুদ্ধের (Cold War) সময়কার একটি অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট কামান ব্যবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইন্টারসেপ্টর মজুদ করার চেষ্টা করছে

এখন প্রশ্ন হলো—িইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলো কতদিন পর্যন্ত এত উচ্চ প্রতিরোধ হার বজায় রাখতে পারবে।

ইসরায়েল অনেক সময় খোলা জায়গায় ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে দেয়—যাতে ব্যয় কমানো যায় এবং মজুত সংরক্ষণ করা যায়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (The Wall Street Journal) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে—কারণ তাদের ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে আসছে।

ইন্টারসেপ্টরের মজুতের পরিমাণ গোপন রাখা হলেও সাম্প্রতিক সংঘর্ষে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান প্রতিরক্ষা অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্রুত নতুন করে মজুত করার চেষ্টা করছে: প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবস্থা (Patriot missile system), স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল (Standard Missile), থাড মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (THAAD missile defense system) ইন্টারসেপ্টর। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ব্যবহার করছে টমাহক ক্রুজ মিসাইল (Tomahawk cruise missile) এবং বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য অন্যান্য অস্ত্র।

গ্রিয়েকো বলেন: “ইন্টারসেপ্টরের মজুত সীমিত, এবং যুক্তরাষ্ট্র এত দ্রুত এগুলো তৈরি করতে পারে না যাতে ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মজুত পূরণ করা যায়।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত একই মার্কিন উৎপাদন লাইনের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু উপসাগরীয় দেশের ইন্টারসেপ্টর পুনরায় সরবরাহের অনুরোধে সাড়া দিতে বিলম্ব করছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র হুথি মুভমেন্টের (Houthi movement) বিরুদ্ধে ইয়েমেন অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিতে চাইছে। সেখানে এক মাসে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেও তারা আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বড় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক রয়েছে সৌদি আরবের। এর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট প্যাক-থ্রি (Patriot PAC-3) দীর্ঘপাল্লার ব্যাটারি, আই-হক মিসাইল সিস্টেম (I-Hawk missile system), ফরাসি ক্রোটেল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Crotale air defence system), শাহিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Shahine air defence system), মিকা মিসাইল সিস্টেম (MICA missile system)। এছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পয়েন্ট-ডিফেন্স লঞ্চার এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান।

বর্তমানে উপসাগরে একমাত্র সৌদি আরবই চীনের তৈরি সাইলেন্ট হান্টার লেজার উইপেন সিস্টেম (Silent Hunter laser weapon system) ব্যবহার করছে, যা ছোট ড্রোন ধ্বংস করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যবহার করে: থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবস্থা, ইসরায়েলের তৈরি বারাক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Barak air defence system)। এছাড়া মাঝারি পাল্লার হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহার করে দক্ষিণ কোরিয়ার চেওনগাং টু ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (Cheongung II missile system)।

কাতার মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহার করে: প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবস্থা, নাসামস থ্রি (NASAMS III)। স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষায় রয়েছে: ইগলা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (Igla missile system), এফআইএম-৯২ স্টিংগার (FIM-92 Stinger), এফএন-৬ মিসাইল ব্যবস্থা (FN-6 missile system), মিস্ট্রাল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (Mistral missile system)

কুয়েত ব্যবহার করে প্যাট্রিয়ট প্যাক-থ্রি ব্যাটারি এবং অন্যান্য স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাহরাইনের কাছেও রয়েছে প্যাট্রিয়ট প্যাক-থ্রি। আর ওমান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের মধ্যে মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে দুর্বল, যদিও তাদের কাছে কিছু স্বল্পপাল্লার ব্যবস্থা রয়েছে।