যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সঙ্গে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পুনরাবৃত্তি করছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা দেন যে একটি “বিশাল নৌবহর”, অর্থাৎ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে কেন্দ্র করে গঠিত একটি “আর্মাডা” পারস্য উপসাগরের দিকে এগোচ্ছে, তখন ব্যবহৃত ভাষাটি একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতির চেয়ে বরং বিংশ শতাব্দীর কোনো সংকটের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। এই ধরনের বক্তব্য সাধারণত কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় শোনা যেত, যখন পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পরাশক্তিগুলো একে অপরের বিপরীতে নৌবহর মোতায়েন করেছিল।
আজ, যখন ইরান তার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের ধাক্কা সামলাচ্ছে এবং ওয়াশিংটন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর এই মোতায়েন একটি কঠোর স্মরণ করিয়ে দেয়—আঞ্চলিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার মুখে বৈশ্বিক রাজনীতির বর্তমান পরিবেশ খুব সহজেই শীতল যুদ্ধ-ধাঁচের শক্তি প্রদর্শন ও মুখোমুখি অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। সে অর্থে, আজকের উপসাগর যেন ১৯৬২ সালের ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। তবে প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প ও খামেনি কি একবিংশ শতাব্দীর কেনেডি ও খ্রুশ্চেভ হয়ে উঠতে পারবেন—উপসাগরে কি আরেকটি কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
এই মুহূর্তের অনুঘটক কোনো একক আদর্শিক সংঘর্ষে নয়, বরং একাধিক পরস্পরসম্পর্কিত ঘটনার ধারাবাহিকতায় নিহিত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়—প্রথমে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও মুদ্রার ভয়াবহ পতনের কারণে, যা দ্রুতই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর জনরোষের সবচেয়ে বিস্তৃত বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। শাসকগোষ্ঠীর সহিংস দমন-পীড়নে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক দশ হাজার মানুষ আটক হয়েছে বলে স্বাধীন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ তথ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরানকে আরও দমন-পীড়ন থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দেন এবং দাবি করেন, গণহত্যা বা পারমাণবিক তৎপরতা পুনরায় শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র শক্ত হাতে জবাব দেবে। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়াশিংটন ইরানের তথাকথিত “শ্যাডো ফ্লিট”-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার লক্ষ্য ছিল তেল আয়ের পথ বন্ধ করে দেওয়া—যে আয় শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
এই ঘটনাপ্রবাহ—অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, বাইরের রাজনৈতিক চাপ এবং এখন দৃশ্যমান সামরিক প্রস্তুতি—একটি ভূরাজনৈতিক গতিবিধি সৃষ্টি করেছে, যা শীতল যুদ্ধের সময়কার প্রতিরোধ ও উত্তেজনা বৃদ্ধির যুক্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। একটি বিমানবাহী রণতরী হামলা গোষ্ঠী মোতায়েন কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ নয়; এটি সামরিক অবস্থানের এমন এক পরিবর্তন, যা রুটিন প্রতিরোধমূলক সংকেতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্য উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইচ্ছা নয়, বরং ক্রমাবনত আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে দূরপাল্লায় কার্যকরভাবে আঘাত হানার সক্ষমতাও প্রদর্শন করে।
ইরানও প্রতিযোগিতামূলক সংকেতের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিয়েছে। জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সীমিত হোক বা ব্যাপক—যেকোনো আক্রমণকে “সর্বাত্মক যুদ্ধ” হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সর্বোচ্চ শক্তিতে তার জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের বাহিনী “আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত, আঙুল ট্রিগারে”, যা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও বাইরের চাপের মধ্যেও শক্তি প্রদর্শনের তেহরানের সংকল্পকে তুলে ধরে।
আলাদাভাবে দেখলে, এই অঙ্গভঙ্গিগুলো—একদিকে মার্কিন নৌবহর, অন্যদিকে ইরানের হুঁশিয়ারি—সংকটকালীন উত্তেজনার স্বাভাবিক উপাদান বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতার প্রেক্ষাপটে এগুলো এমন এক ভূরাজনৈতিক কৌশলপুস্তকে ফেরার ইঙ্গিত দেয়, যা সংকেত, প্রতিরোধ ও ঝুঁকিপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের মতোই, তখনও কেউ যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু উভয় পক্ষ এমন ভঙ্গিতে অবস্থান নিয়েছিল যে বিশ্ব যুদ্ধের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। আজও ওয়াশিংটন ও তেহরান এমন এক বিপজ্জনক পারস্পরিক সম্পর্কে জড়িত, যেখানে ভুল ব্যাখ্যা দ্রুতই অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
কয়েকটি কারণে এই শীতল যুদ্ধের উপমা যথাযথ মনে হয়, যদিও কৌশলগত প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রথমত, আঞ্চলিক উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় বিমানবাহী রণতরী হামলা গোষ্ঠী মোতায়েন হলো শক্তি প্রদর্শনের এমন এক রূপ, যা প্রতিপক্ষের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতেই করা হয়। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার এবং অন্যান্য নৌসম্পদের উপস্থিতি ইরান ও তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ককে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে নির্ভুল আঘাত বা আরও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
দ্বিতীয়ত, এই মোতায়েনের দৃশ্যমানতা ও দূরত্ব—ভারত মহাসাগরসহ দূরবর্তী অঞ্চল থেকে সম্পদ স্থানান্তর—শীতল যুদ্ধের সময়কার সেইসব নৌচালনার কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ়তা দেখাতে মহাসাগর পেরিয়ে নৌবহর পাঠানো হতো।
তৃতীয়ত, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ওয়াশিংটনের বাইরের চাপের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখায় কীভাবে ঘরোয়া গতিবিধি ও বাহ্যিক কৌশলগত অবস্থান একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। শীতল যুদ্ধেও একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট প্রায়ই বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হতো; বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যুক্ত হয়ে গেছে পারমাণবিক বিস্তার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে।
তবে এমন পরিবেশে ভুল হিসাবের ঝুঁকি স্বীকার করাও জরুরি। যেসব সামরিক মোতায়েন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে করা হয়, সেগুলো আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবেও ব্যাখ্যা হতে পারে—বিশেষত যখন কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ সীমিত বা চাপের মুখে থাকে।
আরও একটি জটিলতা তৈরি হয় আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো, যারা তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়া ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চায়, তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে স্বাগত জানালেও অন্যদিকে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষ কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে প্রক্সি শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়তে পারে, বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে এবং এমন জোটগুলো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যেগুলো সরাসরি যুদ্ধের বদলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে।
এ ছাড়া এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন শূন্যতায় ঘটছে না। চীন ও রাশিয়া সরাসরি এই সংকটের প্রধান পক্ষ না হলেও, এই অঞ্চলে তাদের স্বার্থ ও সম্পর্ক রয়েছে, যা পরিস্থিতির ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। উভয় দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেহরানকে সমর্থন করে এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে হয়তো অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে, কিংবা নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখবে। এতে শীতল যুদ্ধের সময়কার বহুপক্ষীয় শক্তির ভারসাম্যের মতো আরেকটি আন্তর্জাতিক জটিলতা যুক্ত হয়।
সুতরাং বর্তমান মুহূর্তটি কৌশলগত সংযম, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা—এমন এক সময়ে, যখন ইতিহাসের উপমা প্রাসঙ্গিক হলেও বাস্তবতাকে পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত করে না। পারস্য উপসাগরের দিকে মার্কিন নৌশক্তির অগ্রগতি এবং ইরানের সতর্ক প্রস্তুতির অবস্থান কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়; এটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের গভীর সংযোগকে প্রতিফলিত করে, যা ভুলভাবে সামলানো হলে খুব দ্রুতই উদ্দেশ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
